বেশিদিন থাকবো না আর

বেশিদিন থাকবো না আর চলে যাবো গোলাপের
গাঢ় গিঁট খুলে
চলে যাবো পিঁড়ির গহন স্নেহ ভেঙে, চলে যাবে,
অনেক বসেছি
বেশি তো থাকবো না আর চলে যাবো মেঘ রেখে,
মমতাও রেখে
মন্ময় কাঁথাটি রেখে চলে যাবো বেশি দেরি নেই!
কুশন ও কার্পেটের নিবিড় গোধূলি ফেলে চলে যাবো
চাই কি ফুলের শুশ্রূষা আর ফুলদানিরও আদর,
চলে যাবো এখাবে বসার সুখ ফেলে, চলে যাবে
বেত, বাঁশ, বস্তুকে মাড়িয়ে,
বেশি দেরি নেই চলে যাবো জমাট মঞ্চেরও মোহ ভেঙে
মেধাকেও পরাবো বিরহ, আত্মাকেও অনন্ত বিচ্ছেদ।
বেশিদিন থাকবো না চলে যাবো এই তীব্র টান
ভেদ করে, ফেলে রেখে এই আন্তরিকতার জামা,
হাতের সেলাই
অধিক থাকবো না আর অনেক জড়িয়ে গেছি চলে যাবো
আসর ভাঙার আগে, আচ্ছন্নতা উন্মেষেরও আগে
চলে যাবো চোখের জলেরও আগে না হলে পারবো না।
Share:

তোমাকে বলেছিলাম

তোমাকে বলেছিলাম, যত দেরীই হোক,
আবার আমি ফিরে আসব।
ফিরে আসব তল-আঁধারি অশথগাছটাকে বাঁয়ে রেখে,
ঝালোডাঙার বিল পেরিয়ে,
হলুদ-ফুলের মাঠের উপর দিয়ে
আবার আমি ফিরে আসব।
আমি তোমাকে বলেছিলাম।

আমি তোমাকে বলেছিলাম, এই যাওয়াটা কিছু নয়,
আবার আমি ফিরে আসব।
ডগডগে লালের নেশায় আকাশটাকে মাতিয়ে দিয়ে
সূর্য যখন ডুবে যাবে,
নৌকার গলুইয়ে মাথা রেখে
নদীর ছল্‌ছল্‌ জলের শব্দ শুনতে-শুনতে
আবার আমি ফিরে আসব।
আমি তোমাকে বলেছিলাম।

আজও আমার ফেরা হয়নি।
রক্তের সেই আবেগ এখন স্তিমিত হয়ে এসেছে।
তবু যেন আবছা-আবছা মনে পড়ে,
আমি তোমাকে বলেছিলাম।
 
 
Share:

আমার সবুজ গ্রাম

                                আমার সবুজ গ্রাম
                        -- মহাদেব সাহা
 
 কতেদিন হয়নি যাওয়া আমার সবুজ গ্রামে
সোনাবিল, পদ্মাদিঘি, উত্তরকঙ্গের
সেই ধুলোওড়া পথ, বিষণ্ন পাথার,
আখ মাড়াইয়ের দৃশ্য, ক্লান্ত মহিস
কতেদিন হয়নি দেখা; কতেদিন হয়নি
শোনা দুপুরে ঘুঘুর ডাক, হুতোম পেঁচার
শব্দ ঃ হয়তো এখনো হাতছানি দিয়ে ডাকে
প্রায় শুকিয়ে যাওয়া গ্রামের নদীটি, কখনো
শহরে সবুজের সমারোহ দেখে এই প্রিয় গ্রামটিকে
মনে পড়ে যায় ঃ কোনো পুরনো দিনের
গান শুনে, দোয়েল-শালিক দেখে
আমি খুবই অন্যমনস্ক হয়ে পড়ি;
ফিরে যাই আমার সবুজ গ্রামে, হাটখোলাটিতে
এখনো টিনের চালে কখনো
বৃষ্টির শব্দ শুনে উত্তরবঙ্গের
সেই দুঃখিনী গ্রামটি মনে পড়ে।
এমন কী আছে তার মনে রাখবার মতো
তবু এই উলুঝুলু বন, বিষণ্ন পাথর
নেহাৎ খালের মতো শুকনো নদীটি, এখনো
আমার কাছে রুপকথার চেয়েও বেশি রুপকথা।
 
 

Share:

মন ভালো নেই

মন ভালো নেই
                         - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
  
মন ভালো নেই মন ভালো নেই মন ভালো নেই
কেউ তা বোঝে না সকলি গোপন মুখে ছায়া নেই
চোখ খোলা তবু চোখ বুজে আছি কেউ তা দেখেনি
প্রতিদিন কাটে দিন কেটে যায় আশায় আশায়
আশায় আশায় আশায় আশায়
এখন আমার ওষ্ঠে লাগে না কোনো প্রিয় স্বাদ
এমনকি নারী এমনকি নারী এমনকি নারী
এমনকি সুরা এমনকি ভাষা
মন ভালো নেই মন ভালো নেই মন ভালো নেই
বিকেল বেলায় একলা একলা পথে ঘুরে ঘুরে
একলা একলা পথে ঘুরে ঘুরে পথে ঘুরে ঘুরে
কিছুই খুঁজি না কোথাও যাই না কারুকে চাইনি
কিছুই খুঁজি না কোথাও যাই না
আমিও মানুষ আমার কী আছে অথবা কী ছিল
আমার কী আছে অথবা কী ছিল
ফুলের ভিতরে বীজের ভিতরে ঘুণের ভিতরে
যেমন আগুন আগুন আগুন আগুন আগুন
মন ভালো নেই মন ভালো নেই মন ভালো নেই
তবু দিন কাটে দিন কেটে যায় আশায় আশায়
আশায় আশায় আশায় আশায় ..
Share:

হলুদ বাঁটিছে মেয়ে

হলুদ বাঁটিছে মেয়ে
                           - জসীম উদ্‌দীন
হলুদ বাঁটিছে হলুদ বরণী মেয়ে,
হলুদের পাটা হাসিয়া গড়ায় রাঙা অনুরাগে নেয়ে।
দুই হাতে ধরি কঠিন পুতারে ঘসিছে পাটার পরে,
কাঁচের চুড়ী যে রিনিক ঝিনিকি নাচিছে খুশীর ভরে।
দুইটি জঙ্ঘা দুইধারে মেলা কাঠ-গড়া কামনার,
তাহার উপর উঠিতে নামিতে সোনার দেহটি তার;
মর্দ্দিত দুটি যুগল সারসী শাড়ী সরসীর নীরে,
ডুবিতে ভাসিতে পুষ্প ধনুরে স্মরিতেছে ঘুরে ফিরে।

হলুদ বাঁটিছে হলুদ বরণী মেয়ে,
রঙিন ঊষার আবছা হাসিতে আকাশ ফেলিল ছেয়ে।
মিহি-সুরী গান গুন গুন করে ঘুরিছে হাসিল ঠোঁটে,
খুশীর ভোমরী উড়িয়া শ্রীমুখ-পদ্মের দল লোটে।
বিগত রাতের বভস-সুখের মদিরা জড়িত স্মৃতি,
সারাটি পাটারে হলুদে জড়ায়ে গড়ায়ে রঙিছে ক্ষিতি।
গাছের ডালে যে বুলবুলী বসি ভরিয়া দুখানা পাখ,
লিখিয়া হইতে তারি একটুকু মেলিছে সুরেলা ডাক।

হলুদ বাঁটিছে হলুদ বরণী মেয়ে,
হলুদে লিখিত রঙিন কাহিনী গড়াইছে পাটা বেয়ে।
ডোল-ভরা ধান, কোল ভরা শিশু, বুক-ভরা মিঠে গান,
কোকিল ডাকান আম্র ছায়ায় পাতার কুটীর খান;
চাঁদিনী রাতের জোছনা আসিয়া গড়ায় বেড়ার ফাঁকে
কৃষাণ কন্ঠে বাঁশীটি বাজিয়া আকাশেতে প্রীতি আঁকে।
অর্দ্ধেক রাত নক্সী-কাঁথাটি মেলন করিয়া ধরি,
অতি সযতনে আঁকে ফুল-লতা মনের মমতা ভরি।
সুখ যেন আসি গড়াইয়া পড়ে, সূতার লতালী ফাঁদে,
মাটির ধরায় টেনে নিয়ে আসে গগন বিহারী চাঁদে।
Share:

ফুল নেয়া ভাল নয়

ফুল নেয়া ভাল নয়
                      ---- জসীম উদ্‌দীন
ফুল নেয়া ভাল নয় মেয়ে।
ফুল নিলে ফুল দিতে হয়, -
ফুলের মতন প্রাণ দিতে হয়।
যারা ফুল নিয়ে যায়,
যারা ফুল দিয়ে যায়,
তারা ভুল দিয়ে যায়,
তারা কুল নিয়ে যায়।
তুমি ফুল, মেয়ে! বাতাসে ভাঙিয়া পড়
বাতাসের ভরে দলগুলি নড়নড়।
ফুলের ভার যে পাহাড় বহিতে নারে
দখিনা বাতাস নড়ে উঠে বারে বারে।
ফুলের ভারে যে ধরণী দুলিয়া ওঠে,
ভোমর পাখার আঘাতে মাটিতে লোটে।
সেই ফুল তুমি কেমনে বহিবে তারে,
ফুল তো কখনো ফুলেরে বহিতে নারে।
 
 
Share:

প্রিয় সেই সময়গুলি

অনেকগুলো দিন গিয়েছে চলে অনেকটা সময় হয়েছে অতিক্রান্ত,
লাভ-লোকসানের হিসাব করে আজ আমি বড়ই পরিশ্রান্ত!
কি হবে এই হিসেব মিলিয়ে? কি হবে আর অঙ্ক কষে?
গুন, ভাগ আর যোগ করে মিললো না কিছুই অবশেষে!
অতীতের পানে চেয়ে দেখি সবকিছুই আজ স্মৃতি।
ভবিষ্যতের পানে চেয়েও তো পেলাম না আশার জ্যোতি!
শৈশবের সেই বন্ধুদের আআর পাই না তো খুঁজে আমি,
এখন বুঝি বাল্যবন্ধুরা ছিল আমার কাছে কত দামী।
স্কুল প্রাঙ্গনে ছোটবেলা সবে খেলাধূলা করেছি কত
তাই দেখে বলতো সবাই ‘এরা চঞ্চল কেন এত?’
মনে পড়ে যায় শৈশবের কথা হাসি আনন্দের দিনগুলি-
চোখের নিমিষে হারিয়ে গেল প্রিয় সেই সময়গুলি!

Share:

তুমি আমায় খোঁজো


জানি আমি, এখনো তুমি আমায় খোঁজো
ভুল করে লুকিয়ে স্বপ্ন দেখে ফেলো
হয়তো তোমার হৃদয়ে এখন, নতুন ফুলের সুবাস
স্মৃতি তোমায় তাড়িয়ে বেড়ায়, এটা আমার বিশ্বাস।

কতো কিছুর মিথ্যে আয়োজন শেখায় বেঁচে থাকা
কেউ জানবে না, অনেক কথা রয়েছে জমা।
দিনের শেষে খুব নীরবে আমরা দু'জন একা
চাচ্ছি না তবুও, হয়ে যাক আরো একবার দেখা।

সময়ের নিষ্ঠুরতায় বিধাতা এঁকে দিয়েছেন নতুন ভাগ্য
বলো, কে জানতো ! এটাই ছিল আমাদের প্রাপ‌্য।
মাঝে দু'টো জীবন এসে জড়ালো যান্ত্রিক মনে
হাসি খেলার দোটানায় ভেসে রইলো আমাদের সাথে।
Share:

নির্লজ্জ আহবান

 
 
বানের জলে-
ভেসে আসা লাওয়ারিশ লাশের শেষকৃত্য
যতটা আদরে অনাদরে করে মানুষ,
ঠিক ততটা আদর আমায় দিও।
এর বেশি আর কিইবা চাইতে পারি?

ফুলদানীর বাসি ফুলটাকে-
ফেলে দিতে গিয়েও " আরেকদিন থাক" বলে
যে সহানুভূতি দেখায় মানুষ,
ঠিক ততটা সহানুভূতি আমায় দেখিয়ো।
এর বেশি আর কিইবা চাইতে পারি?

আর কিইবা চাওয়ার আছে আমার!
আর কিইবা তুমি দিতে পারো,
সুচাগ্র সম মনে কতটাইবা প্রেম
তুমি ধারণ কর!
Share:

তোমার স্নিগ্ধ হাসি


তোমার স্নিগ্ধ হাসির পেছনে ঢাকা পড়ে রয়,
কত জানা অজানা অপ্রাপ্তি, কত অপূর্ণতা!
কত মান অভিমানে ভেঙে যায় হৃদয়,
তবু সদা হেসে যাও তুমি !

মুখের এ স্নিগ্ধ হাসিটুকুই দেখেছে সবাই,
হাসির পেছনে লুকিয়ে রাখা মলিনতা
অদৃশ্য রয়ে গেছে, যেভাবে চেয়েছো সদাই।
নারী, তুমি যে বধু তুমি যে মাতা,
প্রতিদিন সামলে চলো কত প্রতিকূলতা!

স্বামীকে সন্তুষ্ট রাখো নিজেকে উজাড় করে,
বাবা মাকে খুশী রাখো সুখের অভিনয় দিয়ে।
শ্বশুরকূলীয়দের খুশী করো মহা আড়ম্বরে,
বন্ধুদের অসন্দিগ্ধ রাখো কপটতা মিশিয়ে।
একদিন আয়নায় দেখ নিজের মলিন হাসি,
ফুলের মত হাসি বটে, তবে সে ফুল বাসি!
Share:

মাত্র একটি শব্দ


তোমার শাড়ির কুঁচিতে, একটা সম্পূর্ণ আকাশ আছে
কিছুটা ধূসর বাকিটা নীল
বাহান্ন টুকরো মেঘে একটি মাত্র শব্দ ভাসে।

নীলাদ্রিতা,
একটা আগুনরাঙা সকাল
নম্র দুপুর
ভেজা সন্ধ্যা
আর এলোমেলো রাত।

ঐ একটি শব্দ যখন তোমার সামনে দাঁড়াবে
নীল শাড়িতে তোমার চোখ, নিগূঢ় অরণ্যে
আমি চারকোণা একান্ত একটা জানলা করে নেব।

'ভালোবাসি' - তোমায় দেখার অবিচ্ছেদে
এই একটি শব্দই আমি ভুলিয়ে নেব।
Share:

অসহায় মন


যখন গভীর কালো মেঘ গুলো আকাশ কে ছেড়ে ছেড়ে যায়
আমার ও একলা হতে ইচ্ছে করে দূর নীলিমায়
যখন ঝড়ো বাতাসে এ গাছ ও গাছে ঠাঁই না পেয়ে ভেঁজা কাক পাখা ঝাপটায়
মনটা বিমর্ষ হয় বুঝে সে ও একা এমন অসহায়
তবুও জীবন বাঁচে অজস্র নিরাশায়
মিথ্যা গুলো সাথী হয় আর স্বপ্ন গুলো জোয়ারে ভাষায়।
প্রেম ছিল প্রতারনার পোষাকে সব সময়
তাই ছোট ছোট প্রতিজ্ঞা গুলো ধুলোয় মিশে রয়।
কতো হিসেব নিকেশ আর কতো লুকোচুরির খেলায়
মানুষ চিনতে এই মন চিরকালই অসহায় ।
Share:

দিগন্তের হাতছানি

ছোটবেলা থেকেই--
এক অদ্ভূত স্বপ্নের সাথে আমার বসবাস।
আকাশটাকে ছোঁবো আমি...।
মা'র হাজার প্রবোধ, শত প্রলোভনেও,
ইচ্ছেচ্যূতি ঘটতো না আমার।
ঐ আকাশটা আমার চাই।
শেষমেষ আমার জেদের কাছে হেরে যেতো মা,
'কী দস্যি মেয়েরে বাবা!'
তবু আকাশপ্রাপ্তি হতো না আমার।
কিশোরী জীবন যখন,
পুকুর জলে ঝাঁপাঝাঁপি আর গাছের শাখায় ডেরা বাঁধা।
তখনও গাছের মগডালে উঠে,
আকাশের দূরত্ব টা ঠিক মেপে দেখতাম।
যতদূর চোখ যায়...
বিস্তীর্ণ ফসলের ক্ষেতের,
আল ধরে চলতে চলতে,এমনি একদিন...
মনের মাঝে জ্বলে উঠলো সহস্র খুশীর পিদিম।
ঐ তো আকাশ...কত কাছে...
মাটির উপর ক্লান্ত দেহে এলিয়ে আছে।
আজ না হোক, কাল ঠিক ছোঁবো তাকে।
আকাশ পেয়ে গেছি এই খুশীতেই,
মাতোয়ারা আমি তখন।
এখন তো কেবল ছোঁয়ার অপেক্ষা...
দিন ঘুরে মাস যায়, মাস ঘুরে বছর।
ঐ কয়েকটা পদক্ষেপ আর হাঁটা হয় না আমার,
ছুঁয়ে দেখা হয় না আকাশটাকে,
ইচ্ছেটা শুকিয়ে যায় বুকের ভেতর।
দিনগুলো হয়ে ওঠে অথর্ব, ক্লান্তিকর।
বয়সের ভারে ন্যূজ আমার মা,
একদিন বলেই ফেললেন কথায় কথায়;
'তুই না আকাশ ছুঁতে চেয়েছিলি?!'
জীবনের অনেকগুলো বছর পেরিয়ে-
আত্মজার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমি,
কণ্ঠে তার একই ইচ্ছের প্রতিধবনি...
'মা, আমি আকাশ ছোঁবো।'
মুহূর্তেই জ্বলে ওঠে আমার নিভন্ত চোখের তারা,
উদ্দীপ্ত হয়ে উঠি আমি।
মেয়েকে বলি,
"হ্যাঁ মা, ঐ তো আকাশ, খুব কাছে...
চোখের সীমানার কাছাকাছি...হাত বাড়ালেই কাছে আসে।
ধরা ছোঁয়ার কতো কাছে!
কিন্তু তোমায় পাড়ি দিতে হবে অনেক পথ,
যেতে হবে বহূদূর,
গড়তে হবে আপন দিগন্ত।
তাহলেই আকাশটা তোমার।।"


Share:

Social Media Icone

জনপ্রিয় পোষ্ট

Recent Posts

Web hosting